নারীর পোশাক, শরীরের ওজন, বা ব্যক্তিগত জীবন—সবকিছুতেই যেন সমাজের অঘোষিত নজদারি। বিশেষ করে নারীদের সৌন্দর্য বা আচরণের মাপকাঠি সমাজ ঠিক করে দেবে কেন, সেই প্রশ্নই এবার সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরলেন বলিউড অভিনেত্রী হুমা কুরেশি। সম্প্রতি নিজের নতুন শো ‘দিল্লি ক্রাইম সিজন ৩’-এর প্রচারে এসে নারীবাদ, বডি শেমিং ও অনলাইন ট্রোলিং নিয়ে কড়া ভাষায় কথা বলেছেন এই অভিনেত্রী।

ইউটিউব চ্যানেল ‘হাউটারফ্লাই’-এর একটি পডকাস্টে অংশ নিয়ে হুমা কুরেশি নিজের ক্যারিয়ারের প্রথম সংলাপ স্মরণ করে বলেন, ‘জীবনে আমার বলা প্রথম সংলাপটি ছিল—‘তোমার অনুমতি নেওয়া উচিত ছিল। আমার মনে হয়, মৃত্যুর পর আমার কবরের ফলকেও এই কথাটিই লেখা থাকবে।’
সাক্ষাৎকারটিতে তিনি নারীদের বিউটি স্কেল বা সৌন্দর্যের মাপকাঠি, পিরিয়ড নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
অনলাইন ট্রোলিং ও বিদ্রূপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রোলিংয়ের শিকার হওয়া প্রসঙ্গে হুমা বলেন, ‘একজন অভিনেত্রী হিসেবে আমাকে ভিন্ন মাত্রার ট্রোলিং সহ্য করতে হয়। আমি সাধারণত আমার সোশ্যাল মিডিয়ার কমেন্ট সেকশনে যাই না। কেউ হয়তো নিজের জীবনের কোনো হতাশা আমার ওপর ঝাড়ছে, আমি সেই ‘মনের ময়লা’ পড়তে চাই না। তবে এর ফলে ভক্তদের ভালো মন্তব্যগুলোও অনেক সময় মিস হয়ে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজকাল নারীদের অপমান করার জন্য মানুষ যেকোনো শব্দ ব্যবহার করছে। এটা বন্ধ হওয়া দরকার। কেউ কেউ কমেন্টে লেখে, ‘দয়া করে বিকিনি পরে ছবি দিন’। এটা অত্যন্ত লজ্জাজনক ও দুঃখজনক।’
অনলাইনে হেনস্তার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘রাস্তায় কোনো মেয়ের শ্লীলতাহানি করলে যে শাস্তি হওয়া উচিত, অনলাইনে যারা এসব করে তাদেরও একই শাস্তি হওয়া উচিত। কারণ, এই দুই অপরাধের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।’
নারীদের পোশাক ও ‘স্ট্যান্ডার্ড’ নারীদের পোশাক ও জীবনযাপন নিয়ে অহেতুক মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন হুমা। তিনি বলেন, ‘মেয়েদের পোশাক, মেকআপ, তারা কখন বাড়ি ফিরবে, তারা কী করবে কিংবা তাদের ওজন কত—এসব নিয়ে মন্তব্য করা বন্ধ করুন। মেয়েদের জন্য সমাজের একটা দ্বিমুখী স্ট্যান্ডার্ড আছে। আমি যদি হুডি পরি, তবে আমি ‘শালীন’ মেয়ে। আর যদি স্প্যাগেটি টপ পরি, তবে আমি আর ‘শালীন’ থাকি না। আমার জামার হাতার দৈর্ঘ্য কীভাবে আমার ব্যক্তিত্বের পরিমাপ হতে পারে?’
ঋতুস্রাব নিয়ে লুকোছাপা
পডকাস্টে হুমা কুরেশি পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব নিয়ে নিজের ছোটবেলার অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘তখন আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। মা বলেছিলেন, পিরিয়ড শুরু হলে কাউকে বলা যাবে না। আমি অবাক হয়ে তাকিয়েছিলাম। অনেক বছর পর মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন এমন বলেছিলেন? মা উত্তর দিয়েছিলেন, তাঁকেও ছোটবেলায় একই কথা বলা হয়েছিল।’
Editor’s Choice
কোয়ান্টাম কম্পিউটার : এক নতুন বিপ্লবের সূচনা

স্যানিটারি প্যাড কেনার অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তখন পরিস্থিতি অন্যরকম ছিল। দোকানদার স্যানিটারি প্যাড এমনভাবে কাগজে মুড়িয়ে দিত যেন এটা কোনো গোপন নিষিদ্ধ বস্তু, যা কারও জানা উচিত নয়। অথচ এটি একটি স্বাভাবিক, প্রাকৃতিক ও সৃষ্টিকর্তার দেওয়া বিষয়। প্রতি মাসে ৩ থেকে ৫ দিন ধরে চলা এই প্রক্রিয়া নিয়ে মেয়েদের লজ্জা পেতে বাধ্য করা হলে, তা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তা কল্পনা করা কঠিন।’
নারীবাদ মোটেও নেতিবাচক নয় নারীবাদ নিয়ে সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণা ভাঙতে হুমা বলেন, ‘আমরা নারীবাদ শব্দটিকে খুব নেতিবাচক করে ফেলেছি। নারীবাদ মানে কাউকে ছোট করা নয়, বরং সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করা। ছেলে হোক বা মেয়ে, সবাইকে যদি সমান সুযোগ দিয়ে বড় করা হয়, তবে তাদের চিন্তাভাবনাও এক হবে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘নারীবাদী হওয়ার জন্য পুরুষবিদ্বেষী হওয়ার প্রয়োজন নেই। নারীদের উপরে ওঠার জন্য পুরুষদের দমন করারও দরকার নেই। নারী ও পুরুষ একে অপরের পরিপূরক। পুরুষ ছাড়া এই পৃথিবী ভালো হবে না, বরং ভয়ানক হবে।’
বলিউডে সৌন্দর্যের মাপকাঠি ও নিরাপত্তা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ‘কাস্টিং কাউচ’ ও নিরাপত্তা প্রসঙ্গে হুমা বলেন, ‘করপোরেট অফিসে মেয়েরা যেসব সমস্যার মুখোমুখি হয়, ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতেও তাই ঘটে।’ ভক্তদের আচরণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি কখনো ভক্তদের সঙ্গে ছবি তুলতে না করি না। কিন্তু অনেক সময় ছবি তোলার নাম করে কেউ কেউ কোমরে হাত রাখে বা স্পর্শ করে। আমি মেয়ে বলে আমার গায়ে হাত দেওয়ার অধিকার কারও নেই। আমি জানি অনেকে ভালোবাসার টানে এমনটা করে, কিন্তু কেউ কেউ এর সুযোগ নেয়।’
এক পরিচালকের সঙ্গে কথোপকথনের উদাহরণ দিয়ে হুমা বলেন, ‘একজন পরিচালক বলেছিলেন, নিজেকে ‘মেইনটেইন’ করলে আমি অনেক দূর যাব। আমি স্পষ্ট বলেছিলাম, বয়স বাড়া বা বার্ধক্য নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি আমার চেহারা নিয়ে খুশি।’
Editor’s Choice
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবন, শিল্প এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাচ্ছে

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ঠিক করে দেবে না আমি দেখতে কেমন হব। শুরুতে আমার ওজন ৫ কেজি বেশি বলে কথা শোনানো হতো, এখন ওজন কমার পরও কথা শুনতে হয়। মানুষ আসলে কখনোই সন্তুষ্ট হয় না। তাই আমি ওসব পাত্তা দিই না, নিজের জীবন নিজের মতো করে বাঁচতে চাই।’