৪ নভেম্বর, ২০২৫-এর নির্বাচনে জোহরান মামদানি নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র পদে বিজয়ী হওয়ার পর থেকেই তিনি এবং তাঁর শহর আলোচনার কেন্দ্রে। মামদানি শুধু বিজয়ী নন, তিনি ১৮৯২ সালের পর থেকে এই শহরের সর্বকনিষ্ঠ মেয়র হতে চলেছেন, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—তিনিই হবেন নিউ ইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম মেয়র। তবে মামদানি ছাড়াও এই শহরটিও এক অনন্য চরিত্র, যার নিজস্ব ইতিহাস, বৈচিত্র্য এবং চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
নিউ ইয়র্ক শহর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এই শহর থেকে যুক্তরাষ্ট্র দুজন প্রেসিডেন্ট পেয়েছে: প্রথমত, থিওডোর রুজভেল্ট এবং দ্বিতীয়ত, ডোনাল্ড জে ট্রাম্প।
নিউ ইয়র্কের অন্যতম বিশেষত্ব হলো এর বিশাল জনসংখ্যার বৈচিত্র্য। বিভিন্ন জাতি, বর্ণ ও সংস্কৃতির মানুষ এখানে সহাবস্থান করে। সরকারি পরিসংখ্যান এই বৈচিত্র্যের গভীর চিত্র তুলে ধরে। এই শহরের জনসংখ্যার ৪৮% মানুষ ইংরেজী ব্যতীত অন্য ভাষায় কথা বলেন। মোট জনসংখ্যার ৩৭% বিদেশী বংশোদ্ভূত। নিউ ইয়র্কের মোট জনসংখ্যা ৮৫ লাখেরও বেশি। ৮৫ লাখেরও বেশি এই জনসংখ্যার মধ্যে ১২.৫ লাখেরও বেশি এশীয় মানুষ বাস করেন, যাদের মধ্যে ৩০.৭% দক্ষিণ এশিয়া থেকে এসেছেন।

প্রায় ৪০০ বছর আগে, ১৬২৫ সালে, ডাচরা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এই শহরের ভিত্তি স্থাপন করেছিল এবং এর নাম দিয়েছিল ‘নিউ আমস্টারডাম’। এরপর ১৬৬৪ সালে ব্রিটিশরা শহরটি দখল করে এবং ডিউক অফ ইয়র্কের নামানুসারে এর নামকরণ করে ‘নিউ ইয়র্ক’। আজ এই শহর অর্থ, শিল্প, সংস্কৃতি, ফ্যাশন এবং বিনোদনের এক বৈশ্বিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
আমেরিকার বৃহত্তম শহর এবং ‘অভিবাসীর শহর’
নিউ ইয়র্ক শুধু নিউ ইয়র্ক স্টেটের সবচেয়ে জনবহুল কাউন্টিই নয়, এটি পুরো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর শহর। ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ অনুসারে, নিউ ইয়র্ক স্টেটের প্রায় ২০ মিলিয়ন জনসংখ্যার মধ্যে ৮৫ লাখেরও বেশি মানুষ কেবল এই সিটিতেই থাকেন।
মজার বিষয় হলো, এত বড় জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও এখানে কোনো একটি সম্প্রদায় সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। এই শহরকে আজকের নিউ ইয়র্ক হিসেবে গড়ে তুলেছে এখানে বসতি স্থাপন করা মানুষেরা—লেনেপ আদিবাসীদের পর ডাচ, ইউরোপীয়, ‘দ্য গ্রেট মাইগ্রেশন’-এ আসা আফ্রিকান-আমেরিকান এবং পরবর্তীকালে বিশ্বজুড়ে অভিবাসীরা।
মেয়র পদে বিজয় ভাষণে মামদানি যথার্থই বলেছিলেন: “নিউইয়র্ক সর্বদা অভিবাসীদের শহর হবে, অভিবাসীদের দ্বারা নির্মিত এবং অভিবাসীদের দ্বারা পরিচালিত একটি শহর।”
এই শহরের নিজস্ব আকর্ষণ রয়েছে; এটি প্রতিদিন প্রায় এক মিলিয়ন শ্রমিকের পদচারণায় মুখরিত হয়। পুরোনো ছাঁচ ভেঙে দ্রুত পরিবর্তনকে গ্রহণ করার এই ক্ষমতা এ শহরের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
জাতিসংঘের সদর দফতর থেকে শুরু করে বিশ্বের আর্থিক রাজধানীখ্যাত ওয়াল স্ট্রিট পর্যন্ত সবই এই শহরের অন্তর্গত। ইউএস স্টক এক্সচেঞ্জ, নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ এবং নাসডাকও এখানে উপস্থিত। এটি আমেরিকান অর্থনীতির ৯ শতাংশের অংশীদার।

স্ট্যাচু অফ লিবার্টি, ৮৬ তলা এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং, টাইমস স্কোয়ার, সেন্ট্রাল পার্ক এবং ব্রডওয়ে শোর মতো বিশ্ববিখ্যাত আকর্ষণগুলো এই শহরকে বিশ্ব পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তুলেছে।
কালো অধ্যায় এবং বর্তমান চ্যালেঞ্জ
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলা শহরটির জন্য এক কালো অধ্যায়। ১৬ একর জমিতে নির্মিত এবং এক সময়ের শহরের গর্ব ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ার সেই হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়, যেখানে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারান।

সাফল্যের পাশাপাশি, শহরটির নিজস্ব চ্যালেঞ্জও রয়েছে—বিশেষ করে আয় বৈষম্য এবং জাতিগত বৈষম্য। গত এক দশকে এই শহরে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান বেড়েছে। বেকারত্ব এবং শ্রমশক্তির অংশগ্রহণে জাতিগত বৈষম্য কিছুটা কমলেও তা এখনও উচ্চ স্তরে রয়েছে। নতুন মেয়র জোহরান মামদানি এই আয় বৈষম্য দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।