জিনাত আমান : হিন্দি সিনেমার নায়িকাদের ছক ভাঙতে শিখিয়েছেন যিনি

১৯৭০-এর দশকে ভারতীয় সিনেমায় নায়িকাদের চিরাচরিত ভাবমূর্তিতে যিনি বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছিলেন, তিনি হলেন জিনাত আমান। একাধারে মডেল, মিস এশিয়া প্যাসিফিক বিজয়ী এবং সাহসী চরিত্রের এই অভিনেত্রী পর্দায় পশ্চিমা ধাঁচের পোশাক, সিগারেট হাতে উপস্থিত হয়ে রাতারাতি হয়ে উঠেছিলেন নতুন প্রজন্মের প্রতীক। তার উত্থান এবং ব্যক্তিগত জীবনের ঝড়—সবকিছুই ছিল বলিউডের ইতিহাসে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এক অধ্যায়।

জিনাত আমান এমন সব চরিত্রে অভিনয় করেছেন যা তার সময়ে নায়িকাদের জন্য সাধারণ ছিল না

১৯৭০-এর দশকে দেব আনন্দ যখন তার আলোচিত চলচ্চিত্র ‘হরে রামা হরে কৃষ্ণ’ নির্মাণের উদ্যোগ নেন, তখন কোনো প্রতিষ্ঠিত হিন্দি সিনেমার নায়িকা তার ছোট বোনের চরিত্রে অভিনয় করতে রাজি হচ্ছিলেন না। যদিও চরিত্রটি নায়িকার চেয়ে বড় এবং অভিনয়ের অনেক সুযোগ ছিল, তবুও সবাই দেব আনন্দের বিপরীতে রোমান্টিক ভূমিকায় আগ্রহী ছিলেন।

দেব আনন্দ এমন একজন অভিনেত্রীকে খুঁজছিলেন যিনি দেখতে ভারতীয় হলেও পশ্চিমা ধাঁচে বেড়ে উঠেছেন এবং পর্দায় ছোট পোশাক পরা বা সিগারেট ধরা নিয়ে তার কোনো দ্বিধা নেই।

ঠিক সেই সময় দেব আনন্দের বন্ধু অমরজিৎ-এর দেওয়া এক পার্টিতে হাজির হন সদ্য ‘মিস এশিয়া প্যাসিফিক’ খেতাব জেতা জিনাত আমান। আধুনিক পোশাকে পার্টিতে আসেন জিনাত।

নিজের আত্মজীবনী ‘রোম্যান্সিং উইথ লাইফ’-এ দেব আনন্দ লিখেছেন: “জিনাত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আমার সামনে বসেছিলেন। তিনি স্ল্যাকস পরেছিলেন, হাতে একটি ছোট পার্স। হঠাৎ তার হাত পার্সের ভেতরে গেল এবং তিনি এক প্যাকেট দামি সিগারেট বের করলেন।” এরপর তিনি লাইটার দিয়ে সিগারেট ধরালেন। কে দেখছে, সেদিকে তার কোনো খেয়ালই ছিল না। এরপর তার চোখ পড়লো আমার চোখে। তিনি হাসলেন এবং হাত বাড়িয়ে আমার সামনে সিগারেটের প্যাকেট রাখলেন। আমি মাঝেমধ্যে ধূমপান করতাম, তবে এবার সিগারেট নিতে অস্বীকার করিনি।”

দেব আনন্দ পরের দিনই জিনাতকে স্ক্রিন টেস্টের জন্য ডাকেন। জিনাত খুব সহজেই ক্যামেরা-বান্ধব প্রমাণিত হন এবং স্ক্রিন টেস্টে পাশ করেন। এই ছবিতে জিনাতকে নেপালে নিয়ে যান দেব আনন্দ। এই ছবির বিখ্যাত গান ‘দম মারো দম’ মুক্তির আগেই জিনাত আমান পরিচিত অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।


Editor’s Choice 
‘গোল্ডেন ব্লাড’ গ্রুপটি কী, যা বিজ্ঞানীরা ল্যাবে তৈরির চেষ্টা করছেন


এই চলচ্চিত্র জিনাতকে হিন্দি চলচ্চিত্র জগতে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করে এবং তিনি তরুণ, আধুনিক প্রজন্মের প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন। ‘দম মারো দম গার্ল’ রাতারাতি সুপারস্টার হয়ে ওঠেন। তবে তাকে শুধু নায়কের বোনের চরিত্র থেকে বের করে আনতে দেব আনন্দ তার সঙ্গে আরেকটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, যেখানে তিনি একজন আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফার এবং মডেলের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।

রাজ কাপুর ও ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’
জিনাতকে বিখ্যাত করা আরেকটি চলচ্চিত্র হলো রাজ কাপুরের ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’। রাজ কাপুর যখনই কোনো নতুন চলচ্চিত্র শুরু করতেন, তখনই নতুন নায়িকা নিয়ে নানা জল্পনা শুরু হতো। এই ছবির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে।

রাজ কাপুর যখন তার ছবির নায়িকা নির্বাচন নিয়ে ভাবছিলেন, ঠিক তখন জিনাত আমান ঘাঘরা-চোলি পরে এবং চুলে গাঁজরা (ফুলের মালা) লাগিয়ে তার কটেজে পৌঁছান।

জিনাত বলেন, “আমি তার দরজায় কড়া নাড়তেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কে? আমি বললাম, আপনার ভবিষ্যৎ নায়িকা রূপা।”

স্ক্রিন টেস্ট দেওয়ার পর আমি সেই চরিত্রে সুযোগ পেলাম। রাজ কাপুরের শিল্প নির্দেশক ভানু আথাইয়া আমার একটি মাটির প্রতিমা তৈরি করেছিলেন। তিনি সেই মূর্তির ওপর সব ধরনের পোশাক পরিয়ে দেখতেন কেমন লাগে। আমি নিজেকে সম্পূর্ণরূপে রাজ কাপুরের হাতে সঁপে দিয়েছিলাম। তিনি ছিলেন একজন কুমারের মতো আর আমি ছিলাম তার হাতের মাটি।

ছবিটি শেষ হতে দুই বছর সময় লেগেছিল। বেশিরভাগ শুটিং হয়েছিল পুনেতে তার খামারে। প্রতিদিন সকালে আমার জন্য টাটকা ফুল থাকত। তিনি আমার বড় বড় পোস্টার সারা খামার জুড়ে লাগিয়ে রেখেছিলেন।

জিনাত জানান, ক্যামেরার পিছনে রাজ কাপুর খুব কঠোর ছিলেন এবং কোনো কিছুর সঙ্গে আপস করতেন না। গল্পের প্রয়োজনে আমাকে প্রায়শই পানিতে ভিজে যেতে হতো। তবে শুটিং শেষে আমার জন্য সবসময় একটি গরম শাল এবং এক চামচ ব্র্যান্ডি প্রস্তুত থাকত।

একই বছর, কৃষ্ণ শাহ তাকে একটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র ‘শালিমার’-এর জন্য চুক্তিবদ্ধ করেন, যেখানে তার নায়ক ছিলেন রেক্স হ্যারিসন এবং ধর্মেন্দ্র। অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে তার চলচ্চিত্র ‘ডন’ বক্স অফিসে তার চাহিদা আরও বাড়িয়ে তোলে।

ব্যক্তিগত জীবন
১৯৫১ সালের ১৯ নভেম্বর বোম্বেতে জন্মগ্রহণকারী জিনাত একটি মিশ্র সংস্কৃতি থেকে এসেছিলেন। তার বাবা আমানুল্লাহ খান ছিলেন চলচ্চিত্র অভিনেতা মুরাদের চাচাতো ভাই এবং তিনি নিজেও ‘মুঘল-এ-আজম’-এর মতো চলচ্চিত্রের সংলাপ লেখক দলের সদস্য ছিলেন।

জিনাতের খুব ছোটবেলায় তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়। তিনি ভারতে জন্মগ্রহণ করলেও বেড়ে ওঠেন জার্মানিতে এবং পড়াশোনা করেন আমেরিকায়। আমেরিকা থেকে ফিরে তিনি মডেলিং শুরু করেন এবং ১৯৭০ সালে ‘ফেমিনা মিস ইন্ডিয়া’ প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় হন। এরপর তিনি মিস এশিয়া প্যাসিফিক খেতাব জেতেন।

১৯৭১ সালে ওপি রালহান তার ‘হাঙ্গামা’ ছবিতে জিনাতকে প্রথম সুযোগ দেন।

বোল্ড এবং ব্যতিক্রমী চরিত্র
১৯৭০-এর দশকে জিনাত হিন্দি চলচ্চিত্রের নায়িকার চিরাচরিত চিত্র সম্পূর্ণ বদলে দেন। তিনি যে ধরনের পোশাকে আবির্ভূত হতেন, তা আগে ভারতীয় নায়িকাদের মধ্যে খুব কম দেখা যেত। তার চরিত্রগুলো ছিল বেশ সাহসী, যা সাধারণ নায়িকাদের ভূমিকা থেকে ভিন্ন।

জিনাত আমানকে খুব সময়ই শাড়িতে দেখা গেছে

জিনাত প্রায় কোনো ছবিতেই শাড়ি পরেননি। তিনি এমন সব চরিত্র বেছে নিয়েছিলেন যা সেই সময়ে সাধারণ বলে মনে করা হতো না। তিনি ১৯৭৩ সালে ‘ধুঁধ’ ছবিতে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়ানো এক নারীর ভূমিকায় অভিনয় করেন। ‘রোটি কাপড়া অউর মাকান’-এ তিনি কোটিপতির লোভে তার বেকার প্রেমিককে দূরে ঠেলে দেন। ‘আজনাবি’ ছবিতে তিনি এমন একজন নারীর ভূমিকায় অভিনয় করেন যিনি নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য গর্ভপাতের কথা ভাবেন।

‘মনোরঞ্জন’-এ তিনি একজন যৌনকর্মী হিসেবে আসেন যার নিজের কাজ নিয়ে কোনো অনুশোচনা নেই। যখন তিনি ফিরোজ খানের চলচ্চিত্র ‘কুরবানি’-তে বিকিনি পরেছিলেন, তখন তাকে হলিউড অভিনেত্রী বো ড্যারেকের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল।

তিনি পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমার আগে নায়িকারা হয় ভালো চরিত্রে আসতেন অথবা খারাপ, সাদা বা কালো। আমি সম্ভবত প্রথম নায়িকা যে বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে ‘ধূসর’ও একটি রঙ। আমি সেই সময়ের সেরা পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেছি।”

ব্যক্তিগত জীবনে ঝড়
জিনাত যখন পেশাগত জীবনে সাফল্যের চূড়ায়, তখন তার ব্যক্তিগত জীবনে ঝড় আসতে শুরু করে। তিনি সঞ্জয় খানকে বিয়ে করেছিলেন, যিনি তখন বিবাহিত ছিলেন বলে শোনা যায়। তাদের সম্পর্ক খুব অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে শেষ হয়।

অন্য এক প্রসঙ্গে, জিনাতের সঙ্গে দেব আনন্দের ঘনিষ্ঠতা নিয়েও চলচ্চিত্র পত্রিকাগুলোতে আলোচনা শুরু হয়। দেব আনন্দ তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন যে তিনি একসময় জিনাত আমানকে তার ভালোবাসার কথা জানাতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তিনি নিজেকে থামিয়ে দেন।

তিনি লেখেন, “একদিন আমার মনে হলো আমি জিনাত আমানের প্রেমে পড়েছি। আমি তাকে জানাতে চেয়েছিলাম। আমি তাকে ফোন করে বললাম যে আমি তাকে তাজ হোটেলের ‘রনদেভু’ রেস্টুরেন্টে ডিনারে নিয়ে যেতে চাই। জিনাত বললেন যে আমরা আজ অন্য একটি পার্টিতেও যাচ্ছি। আমি বললাম, সেই পার্টির পরে আমরা রেস্টুরেন্টে যাব।”

“আমরা পার্টিতে পৌঁছানোর পর রাজ কাপুর দূর থেকে জিনাতের নাম ধরে ডাকলেন এবং তার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমি হঠাৎ অনুভব করলাম যে তাদের দুজনের মধ্যে কিছু একটা গভীর সম্পর্ক আছে। রাজ কাপুর জিনাতকে তিরস্কার করে বললেন, তুমি তোমার প্রতিশ্রুতি ভেঙেছো। তুমি বলেছিলে তুমি সবসময় সাদা শাড়ি পরেই আমার সামনে আসবে। এই কথা শুনেই আমার মন হাজার টুকরোয় ভেঙে গেল। আমি তখনই রেস্টুরেন্ট ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।”

বর্তমানে জিনাত
১৯৮৫ সালে জিনাত মাজহার খানকে বিয়ে করেন, তাদের দুই সন্তান, আজান এবং জাহানের জন্ম হয়। এই বিয়েও বেশি দিন টেকেনি। মাজহার চাইতেন জিনাত যেন আর চলচ্চিত্রে কাজ না করেন। মাজহার গুরুতর অসুস্থ হয়ে ১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বরে মারা যান।


Editor’s Choice
পেলে ম্যারাডোনা মেসির মধ্যে আসলে সেরা কে?


জিনাত আমান এ বছর ফিল্মফেয়ার আজীবন সম্মাননা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

বর্তমানে জিনাত পর্দার জীবন থেকে অনেকটাই দূরে। এই বছর তিনি ফিল্মফেয়ার লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হন।

তাকে এখন চলচ্চিত্রে কম দেখা যায় কেন জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তর দেন, “হিন্দি ছবিতে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মহিলাদের জন্য খুব কম চরিত্রই লেখা হয়।”

২০০০ সালের পর জিনাত আমান ‘ভোপাল এক্সপ্রেস’, ‘জানা’, ‘না জানে কিউ’, ‘বুম’ এবং ‘পানিপথ’-এর মতো ছবিতে কাজ করেন। কিছুদিন আগে নেটফ্লিক্স ওয়েব সিরিজ ‘দ্য রয়্যালস’-এ যখন তিনি রাজমাতার ভূমিকায় অভিনয় করেন, তখন সব মহলে তার অভিনয়ের প্রশংসা হয়।