গুইলারমো দেল তোরোর ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’: দানব যখন মানুষের চেয়েও মানবিক

মেরি শেলির কালজয়ী উপন্যাস ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ নিয়ে গত ১০০ বছরে অগণিত সিনেমা তৈরি হয়েছে। কখনো তা নিছক ভয়ের ছবি হয়েছে, কখনো বা কমেডি। কিন্তু মেক্সিকান জাদুকর পরিচালক গুইলারমো দেল তোরো (Guillermo del Toro) যখন ঘোষণা দিলেন যে তিনি তাঁর ‘জীবনের স্বপ্ন’ হিসেবে এই সিনেমাটি বানাবেন, তখন থেকেই সিনেপ্রেমীদের অপেক্ষা ছিল—তিনি নিশ্চয়ই এমন কিছু দেখাবেন যা আগে কখনো দেখা যায়নি।

নেটফ্লিক্সে সদ্য মুক্তি পাওয়া ২০২৫ সালের ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ [Frankenstein Movie 2025] সেই অপেক্ষার সার্থক রূপায়ণ। দেল তোরো কেবল ভয়ের গল্প বলেননি, তিনি দেখিয়েছেন এক তীব্র বিষাদমাখা ‘ফাদার-সন’ (বাবা-ছেলে) সম্পর্কের ট্র্যাজেডি।

কাহিনির গভীরতা: স্রষ্টার অহমিকা বনাম সৃষ্টির হাহাকার

গল্পের মূল কাঠামো সবার জানা, কিন্তু দেল তোরো জোর দিয়েছেন চরিত্রের মনস্তত্ত্বের ওপর। ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন (অস্কার আইজ্যাক) এখানে কেবল একজন পাগল বিজ্ঞানী নন, তিনি এক ট্র্যাজিক হিরো—যিনি মৃত্যুকে জয় করতে গিয়ে নিজের জীবনকেই নরক বানিয়ে ফেলেন।

অন্যদিকে, ভিক্টরের সৃষ্টি করা ‘ক্রিয়েচার’ বা দানবটি (জেকব এলর্ডি) জন্মের পর থেকেই এক অনাথ শিশুর মতো। সে জানে না সে কে, কেন তাকে তৈরি করা হয়েছে। সে ভালোবাসা চায়, স্পর্শ চায়। কিন্তু তার স্রষ্টা তাকে দেখে ঘৃণাভরে মুখ ফিরিয়ে নেন। পরিত্যক্ত হয়ে সেই দানব যখন পৃথিবীর পথে নামে, তখন সমাজের নিষ্ঠুরতা তাকে বাধ্য করে হিংস্র হতে। ছবির চিত্রনাট্য দর্শককে বারবার এই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—ভিক্টর কি কেবল হাড়-মাংস জোড়া দিয়ে একটি শরীরই তৈরি করেছিলেন, নাকি তিনি একটি ‘আত্মা’কেও কষ্ট দেওয়ার জন্য পৃথিবীতে এনেছিলেন?

অভিনয়ে বিস্ময়: জেকব এলর্ডি ও অস্কার আইজ্যাকের দ্বৈরথ

জেকব এলর্ডি (দ্য ক্রিয়েচার): চকোলেট বয় ইমেজ ভেঙে জেকব এলর্ডি এখানে নিজেকে আমূল বদলে ফেলেছেন। ভারি মেকআপের নিচে তার আসল চেহারা দেখা যায় না, কিন্তু তাঁর শরীরী ভাষা এবং চোখের অভিব্যক্তি ছিল অসামান্য। দানবটির হাঁটাচলার মধ্যে এক ধরনের আড়ষ্টতা, কিন্তু তার অনুভূতির প্রকাশ ছিল মানুষের চেয়েও তীব্র। বিশেষ করে অন্ধ বৃদ্ধের সঙ্গে তার সখ্যতা এবং পরবর্তীতে বিচ্ছেদের দৃশ্যটি দর্শকদের চোখে জল আনতে বাধ্য। তিনি প্রমাণ করেছেন, সংলাপ ছাড়াও কীভাবে কেবল গোঙানি আর নিশ্বাসের শব্দ দিয়ে অভিনয় করা যায়।

অস্কার আইজ্যাক (ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন): ভিক্টর চরিত্রে অস্কার আইজ্যাক ছিলেন দুর্দান্ত। তাঁর চরিত্রের পাগলামি, অহংকার এবং পরবর্তীতে তীব্র অনুশোচনা—সবকিছুই তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। ভিক্টর চরিত্রটি দর্শকদের সহানুভূতি পাবে না, কিন্তু তার যন্ত্রণাকে অস্বীকার করার উপায়ও নেই।

পাশাপাশি এলিজাবেথ চরিত্রে মিয়া গথ এবং ডক্টর প্রেটোরিয়াস চরিত্রে ক্রিস্টফ ওয়ালৎজ ছিলেন যথাযথ। বিশেষ করে ওয়ালৎজের চরিত্রটি গল্পে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে, যা মূল উপন্যাসে সেভাবে ছিল না।

গুইলারমো দেল তোরো মানেই এক অন্ধকার রূপকথার জগত। এই সিনেমাতেও তার সিগনেচার স্টাইল স্পষ্ট।

ভিজ্যুয়াল ট্রিট: সিনেমাটোগ্রাফার ড্যান লাউস্টসেনের ক্যামেরায় প্রতিটি ফ্রেম যেন এক একটি পেইন্টিং। ভিক্টোরিয়ান যুগের লন্ডন, স্কটল্যান্ডের কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড় এবং বরফে ঢাকা মেরু অঞ্চল—সবকিছুই পর্দায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আলোর ব্যবহার ছিল অসাধারণ; বিশেষ করে ল্যাবরেটরিতে বিদ্যুৎ চমকানোর দৃশ্য এবং আগুনের ব্যবহার ছিল চোখে লেগে থাকার মতো।

মেকআপ ও এফেক্টস: বর্তমানের সিজিআই নির্ভর যুগে দেল তোরো জোর দিয়েছেন প্র্যাকটিক্যাল এফেক্টসের ওপর। দানবটির মেকআপ এত নিখুঁত যে তার সেলাই করা চামড়া এবং অসমঞ্জস পেশীগুলো বাস্তব মনে হয়। এটি সিনেমাটিকে এক ধরনের ‘র’ (Raw) বা অকৃত্রিম অনুভূতি দিয়েছে।

আবহসংগীত: আলেকজান্দ্রে ডেসপ্ল্যাটের সুর সিনেমাটির বিষাদগ্রস্ত মেজাজকে আরও গাঢ় করেছে। চেলো এবং ভায়োলিনের করুণ সুর দানবটির একাকীত্বকে মূর্ত করে তুলেছে।

কিছু দুর্বলতাও কি আছে?

এত কিছুর পরেও সিনেমাটি অবশ্যই শতভাগ ত্রুটিমুক্ত নয়। 

মন্থর গতি: যারা আধুনিক দ্রুতগতির হরর বা অ্যাকশন থ্রিলার দেখে অভ্যস্ত, তাদের কাছে সিনেমার মধ্যভাগ কিছুটা ধীরলয় মনে হতে পারে। পরিচালক চরিত্রের বিকাশে এতটাই সময় নিয়েছেন যে, মাঝে মাঝে গল্পের গতি কমে যায়।

দৈর্ঘ্য: প্রায় আড়াই ঘণ্টারও বেশি দৈর্ঘ্যের এই সিনেমাটি কিছুটা মেদহীন করা যেত। বিশেষ করে এলিজাবেথ ও ভিক্টরের কিছু দৃশ্য পুনরাবৃত্তিমূলক মনে হতে পারে।

কেন দেখবেন?

২০২৫-এর ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ কেবল ভয়ের ছবি নয়, এটি অস্তিত্ববাদের ছবি। এটি আমাদের শেখায় যে, চেহারা নয়, মানুষের আচরণই তাকে দানব বা মানবিক করে তোলে। দেল তোরো মেরি শেলির সৃষ্টিকে সম্মান জানিয়েও তাকে নিজের মতো করে বিনির্মাণ করেছেন।

সিনেমাটি শেষ হওয়ার পর আপনি যখন পর্দা থেকে চোখ সরাবেন, তখন ভয়ের চেয়ে এক গভীর হাহাকার আপনাকে গ্রাস করবে। আর সেখানেই এই সিনেমার সার্থকতা। সত্যিকারের ভালো সিনেমা দেখতে চাইলে, এই উইকেন্ডে ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ আপনার ওয়াচ-লিস্টের শীর্ষে থাকা উচিত।